স্বাভিমানী বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

 – গোপাল চন্দ্র হালদার

শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের — অন্যতম গৃহী ভক্ত ছিলেন শ্রীযুক্ত অধরলাল সেন । পেশায় ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। ১৮৮৪খ্রীষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর। ঠাকুর এসেছেন অধরলাল সেনের বাড়িতে। সাহিত্য সম্রাট  বঙ্কিমচন্দ্র তখন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে কর্মরত। তিনি অধর সেনের বন্ধু । বঙ্কিমচন্দ্র আজ বিশেষ ভাবে নিমন্ত্রিত বন্ধুর বাড়িতে।

প্রাথমিক পরিচয় পর্ব শেষ হয়েছে ৷ শ্রীরামকৃষ্ণ সহাস্যে বঙ্কিমচন্দ্রকে প্রশ্ন করলেন,—-” তুমি কার ভাবে বাঁকা গো ! ”

বঙ্কিমচন্দ্র হাসতে হাসতেই জবাব দিলেন— ” আর মহাশয় ! জুতোর চোটে। সাহেবের জুতোর চোটে বা৺কা।”

বঙ্কিমচন্দ্রের এই জবাবে পাঠক স্বভাবতঃই মনে করতে পারেন, বঙ্কিমচন্দ্র সাহেবদেরকে (ইংরেজ সরকার) খুব ভয় করতেন । হয় তো বা তিনি ছিলেন দুর্বল প্রকৃতির মানুষ। তাঁর চারিত্রিক বলিষ্ঠতা, স্বাভিমানবোধ,স্বদেশপ্রীতি ইত্যাদি ছিল না । বলাবাহুল্য এ উত্তর ছিল সম্পূৰ্ণ তাৎক্ষণিক জবাব মাত্র। স্বভাবে চরিত্রে তিনি ছিলেন এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ভারতীয়  বলে বঙ্কিমচন্দ্রের কর্মজীবনে ইংরেজ সরকারের সাথে বেশ কিছু সংঘাত সংঘটিত হয়েছে। বহু প্রতিকূলতা এসেছে । এমনকী পদোন্নতির ক্ষেত্রেও তিনি বঞ্চিত হয়েছেন। তথাপিও কখনো তিনি ইংরেজ সরকারের সাথে আপোস করে চলেননি,অন্যায়ের সাথে আপোস করেন নি ।নতি স্বীকার করেননি ইংরেজদের রক্তচক্ষুর কাছে । শুধু যে শারীরিক ভাবে তিনি সক্ষম ও সবল ছিলেন তা নয়; মানসিকতায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত ঋজু, দৃঢ় প্রত্যয়ে প্রতিষ্ঠিত এক অনন্যসাধারণ স্বাভিমানী পুরুষ। তাঁর স্বাধীকার, স্বাধীনতাপ্রিয়তা , স্বাদেশিকতা সম্পর্কে তিনি ছিলেন অতিমাত্রায় সচেতন। ভারতীয় জাতীয়তাবোধ জাগরণের অন্যতম ভগীরথ। পাশ্চাত্ত্য জ্ঞান , বিজ্ঞান, শিক্ষা-সংস্কৃতি, দর্শন, যুক্তিবাদে সমৃদ্ধ হয়েও ভারতীয়ত্ব বা হিন্দুত্বকে অস্বীকার করেন নি।সনাতন হিন্দু ধর্মের বেদ,পুরাণ উপনিষদে যেমন দখল ছিল তেমন ব্যুৎপত্তি ছিল ইংরেজি সাহিত্যে। অন্যদিকে পরম শ্রদ্ধায় আত্মস্থ করেছিলেন রুসো, বেন্থাম মিল প্রমুখ দার্শনিকদের দর্শনতত্ত্ব ।

শ্রী রামকৃষ্ণদেব ও বঙ্কিমচন্দ্রের যে কথোপকথন দিয়ে শুরু,তার সময়কালটি লক্ষণীয়। বঙ্কিমচন্দ্রের বয়স তখন সাতচল্লিশ বৎসর। সাহিত্যিক এবং প্রশাসক হিসেবে তিনি তখন খ্যাতির শীর্ষে।গৌরবের গরিমায় গরিয়ান । উল্লেখ্য তাঁর ‘বন্দেমাতরম’শীর্ষক রাষ্ট্রগীত রচিত হয়েছে১৮৭৫-এ । স্বদেশপ্রেমের প্রেক্ষাপটে খ্যাতনামা উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’ রচিত হয়েছে ১৮৮১-তে।জাতীয়তাবাদী চেতনার সেই ঊষালগ্নে উক্ত রাষ্ট্রগীত এবং আনন্দমঠ উপন্যাসটি নাড়া দিয়েছিল হাজার হাজার যুবমানসকে: যাঁদের চেতনা অনুপ্রানিত হয়েছিলো অগ্নিযুগের বিপ্লবী হতে,শহীদ হতে । অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত অকুতোভয় যুবকদের স্বপ্ন ভারতের স্বাধীনতা। ‘বন্দেমাতরম্’ও ‘আনন্দমঠ’কে কেন্দ্র করে উজ্জীবিত হয়েছিলো ভারতীয় জাতীয়তাবাদের বাঁধভাঙা জোয়ার ।

বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য জীবনের শুরু থেকেই দেশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তাঁর নিজস্ব স্বতন্ত্র চিন্তা ভাবনা বহু লেখার  মধ্যে স্পষ্ট প্রকাশ করেছেন। প্রকৃত স্বাধীনতা বলতে তিনি নেতাদের সুখ সমৃদ্ধির কথা বলতে চাননি। তাঁর কাছে প্রকৃত স্বাধীনতার স্বরূপ ছিল—-সাধারণ জনগনের সুখ সমৃদ্ধি। সাধারণ নাগরিকসহ দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রায় নিশ্চয়তা। শাসকগণ যদি সাধারণ নাগরিকের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়ে, তার মত প্রকাশের অধিকার কেড়ে নিয়ে, স্থায়ী উন্নয়নের বদলে তাত্ক্ষনিক সুখ সুবিধা দিয়ে ক্রমাগত দুর্বল এবং পরমুখাপক্ষী ক্লীবত্বের নেশা জাগায় (বর্তমানে যা চলছে) তাহলে দেশবাসী কর্তৃক শাসিত সে দেশ বঙ্কিমচন্দ্রের অনুভবে পরাধীন । এমন স্বরাজে বঙ্কিমচন্দ্র কোনোদিন আস্থা রাখেননি ।

সমাজ চেতনায় সমৃদ্ধ তাঁর প্রবন্ধাবলি ,’বঙ্গদেশের কৃষক,’ কমলাকান্তের দপ্তর’, ‘ সাম্য’ , …

আলোচনার শিরোনাম যে শব্দে বন্দী সেই  প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনের কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে ।

১৮৭৩ সনের ১৫ ডিসেম্বর। বঙ্কিমচন্দ্র তখন বহরমপুরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে কর্মরত।তিনি প্রতিদিনের মতোই ঐ দিন পালকি চেপে বহরমপুর স্কোয়ার ফিল্ডের মধ্য দিয়ে  গঙ্গার কাছে নিজের বাসায় ফিরছিলেন। ঠিক ঐসময় কয়েকজন ইংরেজ  ঐমাঠে ক্রিকেট খেলছিলেন। অন্যদিকে অধ্যক্ষ রবার্টহ্যাণ্ড, রেভারেণ্ড বার্লো,জজ বেসব্রিজ প্রমুখ সাহেবরা খেলা উপভোগ করছিলেন। খ্যাতনামা কয়েকজন বাঙালি ও উপস্থিত ছিলেন । বঙ্কিমচন্দ্রের পালকিকে মাঠের মধ্যে দিয়ে আসতে দেখে  দায়ীত্বে থাকা উপস্থিত গোরা সৈন্যদের মধ্য থেকে কর্ণেল ডাফিন রাগান্বিত হয়ে ছুটে এসে বঙ্কিমচন্দ্রের পালকি থামিয়ে অন্য রাস্তা দিয়ে যেতে হুকুম দেন । কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র কিছুতেই সেই হুকুম তামিল করতে সম্মত হলেন না। ফলে গোরা সৈন্যদের সঙ্গে তাঁর বচসা শুরু হয় এবং ক্রমে তা হাতাহাতিতে গড়ায় ।উপস্থিত বাঙালিদের সহায়তায় ঘটনাটি  সাময়িকভাবে মিটে যায়।কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র কিছুতেই এই প্রকাশ্য অপমান হজম করেননি। প্রতিবাদস্বরূপ সাহেবদের বিরুদ্ধে তিনি অপমানজনিত ফৌজদারি মামলা রুজু করেন।ঘটনাটি গোটা শহরে বেশ উত্তেজনা সৃষ্টি করেছিল।

বিচারপর্ব। আসামী কর্ণেল। ইংরেজ আধিকারিক।অভিযোগকারী বঙ্কিমচন্দ্র, ভারতীয়। বিচারপতি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উইণ্টার, তিনিও ইংরেজ। বিচারের আগে জজ বেসব্রিজ ম্যাজিস্ট্রেট উইণ্টার মহাশয়ের সঙ্গে দেখা করলেন।শলাপরামর্শ হল । ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্রকে মামলটি তুলে নিতে অনুরোধ করলেন।বঙ্কিমচন্দ্র অকুতোভয়। জানালেন — প্রকাশ্য অপমানের ফয়সালা প্রকাশ্যেই হবে।তিনি অন্যায়ের বিচারপ্রার্থী। ১৮৭৪ সনের ১২ জানুয়ারি আসামী কর্ণেল ডাফিনকে আদালতে তলব করা হল।  বিচারপতি উইণ্টার মহাশয়ের নির্দেশে আসামী কর্ণেল ডাফিন প্রকাশ্য আদালতে উপস্থিত বহু ইংরেজ ও বাঙালি যুবকের সামনে বঙ্কিমচন্দ্রের দুটি হাত ধরে ক্ষমা চাইলেন।বাঙালি যুবকদের হর্ষোধ্বনিতে আদালত চত্বর মুখরিত হল। ইংরেজ রাজত্বে বাস করে, ইংরেজদের অধীনে কর্মরত থেকে, ইংরেজদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার সাহস সেদিন ক’জন ভারতীয় রাখতে পেরেছিলেন? বঙ্কিমচন্দ্র, বিদ্যাসাগর, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়-এর মতো অকুতোভয় ভারতীয়রা তাই আজও প্রণম্য।

বঙ্কিমচন্দ্র ১৮৮৫খ্রী, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সভার (Senate) সভ্যপদে বৃত হন এবং আমৃত্যু ঐ পদে বহাল থাকেন। সর্বদাই তিনি দৃঢ়তার সাথে নিজের স্বাধীন মত প্রকাশ করতেন। খোসামোদ নামক রুচিহীন প্রবৃত্তিটি কখনও তাঁর জীবনখাতায় আঁচড় কাটতে পারেনি।

একবার এক বিলাত-ফেরৎ বাঙালি সাহেব বঙ্কিমচন্দ্রকে একটি চিঠি লেখেন। ঠিকানা লিখতে গিয়ে তিনি খামের উপর ‘মিষ্টার বঙ্কিমচন্দ্র’ লিখেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র প্রত্যুত্তরে লিখেছিলেন— “এ বাড়িতে মিষ্টার বঙ্কিমচন্দ্র বলিয়া কোনও ব্যক্তি নাই, আপনি বোধহয় সেকথা বিস্মৃত হইয়াছেন ।”  তিনি বলতেন, ” যতদূর ইংরেজি চলা আবশ্যক,ততদূর চলুক। কিন্তু একেবারে ইংরেজ হইয়া বসিলে চলিবে না। বাঙ্গালী কখনও ইংরেজ  হইতে পারিবে না। —–আমরা যত ইংরেজি পড়ি, যত ইংরেজি কহি,বা যত ইংরেজি লিখি না কেন, ইংরেজি কেবল আমাদিগের  মৃত সিংহের চর্ম্মস্বরূপ  হ ইবে মাত্র। ডাক ডাকিবার সময়ে ধরা পড়িব ।”

বঙ্কিমচন্দ্রের দূরদর্শিতা আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর চিন্তা-চেতনার ,তাঁর রচনার কেন্দ্রবিন্দু ভারতীয়ত্ব এবং হিন্দুত্ব হয়েও সাম্যবাদের ছোঁয়ায় তা পবিত্ৰ এবং প্রোজ্জ্বল। মানুষ তাঁর কাছে মানুষ ই। তথাপি হিন্দুপ্রীতির স্নিগ্ধ সিন্ধুতে স্নাত হয়ে ‘সীতারাম’. উপন্যাসের সীতারামের কণ্ঠে পরিবেশন করেছেন এক জাজ্বল্য  প্রশ্ন— ” হিন্দুকে হিন্দু না রাখিলে কে রাখিবে ?”

(লেখক বিদ্যা ভারতী পূর্বাঞ্চলের সহ-সভাপতি।)

और पढ़ेंশ্রী ডি রামকৃষ্ণ রাও , সভাপতি , বিদ্যাভারতী অখিল ভারতীয় শিক্ষা সংস্থান , ” জাতীয় শিক্ষানীতি ” সম্পর্কিত প্রেস বার্তা।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published.